বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ০২:৫৩ অপরাহ্ন

ইট ভাটার আগুনের দূষিত ধোঁয়ায় পুড়ে কলো হয়ে গেছে কৃষকের জমির ধান

  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৩ মে, ২০২০, ৭.০৫ পিএম
  • ১০১ বার পঠিত
মো: মাহাবুব আলম (ময়মনসিংহ) : ইট ভাটার আগুনের দূষিত ধোঁয়ায় পুড়ে কলো হয়ে গেছে কৃষকের জমির ধান। ফসলের মাঠে একরের পর একর জমিতে ধানের গাছ আছে ঠিকই, কিন্তু ধান নেই। সব চিটা হয়ে গেছে। বায়ু দূষনের কারণে মৌসুমী ফল পচে গাছ থেকে ঝরে যাচ্ছে । পুকুরের মাছও মরে যাচ্ছে। ঘরের নতুন টিনে দ্রুত মরিচা ধরেছে। আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শ্বাসকষ্ট, চর্ম, হার্টের রোগীর সংখ্যা। ১৫ বছর ধরে ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় এভাবেই পুড়ছে পুরো গ্রামটি। এমন চিত্রই দেখা গেছে ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার ৭ নম্বর সালটিঁয়া ইউনিয়নের জালেশ্বর গ্রামে। সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, উপজেলার জালেশ্বর গ্রামের মধ্যপাড়ায় ৭০-৮০টি বাড়ির প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষ কোনো না কোনো ভাবে এই ইট ভাটার জন্য ক্ষতির শিকার। গ্রামটির ঠিক মাঝখানে পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো প্রকার নির্দেশনা না মেনে জোরপূর্বকভাবে গড়ে উঠেছে জালেশ্বর বিক্স নামে একটি ইট ভাটা। যার চারপাশে রয়েছে বিশাল এলাকা জুড়ে কৃষকের তিন ফসলী আবাদি জমি। যেখানে গত ২ মৌসমে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে সাধারণ কৃষক। জালেশ্বর গ্রামের নব্বই বছরের বৃদ্ধ আব্দুর রশিদ আক্ষেপ করে বলেন, গত ১৫ বছর ধরে এ গ্রামের মানুষ এই ইট ভাটার ক্ষতিকর ধোঁয়ার শিকার। সরকার বাড়ির আব্দুল হামিদ (৬৫) বলেন, বাড়িঘরের ২০০ মিটার দূরে ভাটার কয়লা ভাঙার মেশিন চলে দিন-রাত। এ শব্দের কারণে বাচ্চারা ঘুমাতে এবং পড়ালেখাও করতে পারছে না। ফারুক মৌলবী বাড়ির মো. কামাল হোসেন অভিযোগ করে বলেন, দক্ষিণপাড়ায় প্রায় ১০ একর কৃষি জমির মাঝখানে এই ইট ভাটাটি জোরপূর্বক নির্মাণ করেছে মৃত আব্দুর রহিম মাস্টারের ছেলে মো. মোজাম্মেল হক বুলবুল মিয়া। এ বিষয়ে আমরা গ্রামবাসী অনেকবার তাকে এটি সরিয়ে নিতে বললেও সে জোর করেই ভাটাটি চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে মাছ ব্যবসায়ী আলতাফ জানান, ১০ কাঠা জমিতে আমার একটি মাছের ফিসারি। এটি আমার একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম। ৮ মাস আগে ৫০ হাজার টাকার তেলাপিয়া, রুই, সিং, কাতল মাছ চাষ করে ছিলাম। সব তেলাপিয়া মাছ মরে এখন পুকুরশূন্য। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে থাকা আম, কাঠাল, জলপাই, বেল, কলাসহ সকল গাছপালা কালো হয়ে সব ফল পচে নষ্ট হয়ে পড়ে যাচ্ছে। কোনো শাক-সবজির ফলনও এখানে হয় না। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে গ্রামের শিশুদের জীবন। আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শ্বাসকষ্ট, চর্ম, হৃদরোগীর সংখ্যা। ইট ভাটার এই দূষিত কালো ধোঁয়ায় একই ঘরে শিশুসহ চারজন হৃদরোগে আক্রান্ত। জানা যায়, আগস্ট মাস থেকে মে মাস পর্যন্ত ৯ মাস বিরামহীন চলে এই হাওয়াই অটো ইট ভাটা। ভাটার চুঙ্গি নিচু থাকার ফলে তেজস্ক্রিয়াযুক্ত কালো ধোঁয়া গ্রামটিকে গ্রাস করে নিচ্ছে। কৃষি জমির সেচ কাজে গভীর নলকুপের লাইসেন্স নিয়ে ইট ভাটার মালিক বুলবুল গ্রামের একশত একর জমিতে পানি বন্ধ করে পতিত রেখেছে বলে অভিযোগ তুলেন এলাকাবাসী। ইটভাটাটি শিগগিরই বন্ধের দাবিতে গ্রামবাসীর পক্ষে গত ৭ মে ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসক, গফরগাঁও উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর স্মারকলিপি ও অভিযোগ দিয়েছেন মো. ফারুক গং।
ইতোপূর্বেও এবিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নানা উদ্যোগ নেয়া হয় ইট ভাটা বন্ধের জন্য। তবে প্রভাবশালী মহলের ইন্ধনে অবৈধভাবে গড়ে উঠা ব্রিকফিল্ডটি বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে জানান এলাকাবাসী। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ গফরগাঁও-১০ আসনের সংসদ সদস্য ফাহমী গোলন্দাজ বাবেল বলেন, বিষয়টি আমি আপনার মাধ্যমে অবগত হলাম। বিষয়টি ইউএনও এবং জেলা প্রশাসক দেখেন। আমাকে কেউ অভিযোগ দেয়নি বা জানায়নি। এখন আমি জেনেছি। দ্রুত ব্যবস্থা নিবো। তিনি দ্রুত পরিবেশ অধিদপ্তর বরাবর ডিও লেটার দিয়ে ইট ভাটাটি বন্ধ করার ব্যবস্থা করবেন বলেও জানান। গফরগাঁও উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাজী মাহবুব উর রহমান ইট ভাটার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, অভিযোগ পেয়েছি, ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। করোনা ভাইরাসের কারণে অন্য কার্যক্রম গুলো একটু ধীর গতি হয়ে পড়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা। অন্যদিকে, ইটভাটায় নয়, খরার কারণে ধানসহ ফসল নষ্ট হচ্ছে দাবি করে ইট ভাটার মালিক মোজাম্মেল হক বুলবুল বলেন, ১৮ বছর ধরে সরকারকে ভ্যাট দিয়ে ইট ভাটা চালাচ্ছি। ক্ষতিকর হলে উপজেলা নির্বাহী অফিসারই এটি বন্ধ করে দিতেন। তিনি জানান, কৃষকের ধান নষ্ট হওয়ায় ১০ মন ধানের দাম ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন। তবে কৃষকরা তা নেয়নি।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

themesbazar1254120z

এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।

অত্র পত্রিকায় প্রকাশিত কোন সংবাদ কোন ব্যক্তি বা কোন প্রতিষ্ঠানের মানহানিকর হলে কর্তৃপক্ষ দায়ী নহে। সকল লেখার স্বত্ব ও দায় লেখকের।

Founder Md. Sakil